মুসলিম ঐতিহাসিক ও দার্শনিক ইবনে খালদুন
আল্লাহ তায়ালা মানব জাতির কল্যাণে যুগে যুগে পৃথিবীতে অসংখ্য নবী - রাসুল ও মনীষীগণ কে পাঠিয়েছেন । যে কজন মুসলিম মনীষী মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, শিল্প, সাহিত্য, ও ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে অবদানের জন্য আজও সমগ্র বিশ্বে অমর হয়ে আছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ইবনে খালদুন। ১৩২২ খ্রিস্টাব্দে ২৭ শে মে আফ্রিকার তিউনিসিয়া এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম আবু জায়েদ ওয়ালী উদ্দিন ইবনে খালদুন। তার পিতার নাম মুহাম্মদ ইবনে খালদুন। 'খালদুন' হচ্ছে তাদের বংশীয় উপাধি। তার পিতামহ তিউনিসের সুলতানের মন্ত্রী ছিলেন। পিতা ছিলেন খুব জ্ঞান পিপাসু। ছোটবেলা থেকেই ইবনে খালদুন জ্ঞান সাধনা মশগুল হয় এবং তার মেধা শক্তি ছিল বিস্ময়কর। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআনের তফসির শিক্ষা শেষ করেন। দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, বিষয়গুলির প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ। যেকোনো বিষয়ে কোনো বই পেলেই তিনি তা পড়ে শেষ করে ফেলতেন। আমরা ইতিহাস গুলো দেখতে পাই প্রায় প্রত্যেক মানুষই নিজ মাতৃভূমিতে মর্যাদা পাননি বরং অনেক সময় বিতাড়িত হয়েছেন। ইবনে খালদুন ও তা থেকে রেহাই পাননি তাঁকেও ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। তিউনেশিয়ার সুলতান আবু আব্দুল্লাহকে তার ভাই আবুল আব্বাস হত্যা করে রাজ্য ছিনিয়ে এবং ইবনে খালদুনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ইবনে খালদুন কোন উপায়ে তিউনেশিয়ার বগী রাজ্য ছেড়ে মরক্কে চলে যান। মরক্কোর সুলতান আব্দুল আজিজ ইবনে আল হাসান এই ক্ষুদ্র রাজ্যটি দখল করে নিলে তিনি সুলতানের হাতে বন্দি হন। সুলতান ইবনে খালদুনের জ্ঞান প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে মুক্তি দানের আদেশ দেন। আন্দলুসিয়ার সুলতান কর্তৃক মরক্কো দখল হলে ইবনে খালদুন পুনরায় গ্রেপ্তার হন এবং আনুমানিক ১৩৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুক্তিলাভ করেন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব যিনি দুঃখ-কষ্ট কে বরণ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু সত্য ও ন্যায় কে প্রকাশ করতে তিনি কাউকে ভয় করতেন না। বারবার তার বিরুদ্ধে হতে থাকা ষড়যন্ত্র এর ফলে তিনি বনু আরিফ প্রদেশের চলে যান এবং শান্তিতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি আমের মুহাম্মাদ ইবনে আরিফের দেওয়া নিরাপত্তা ও সহযোগিতায় 'আল মুকাদ্দিমা' গ্রহন্ত রচনা করেন। এই কিতাবের মাধ্যমে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক হিসাবে সুখ্যাতি লাভ করেন। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে ঐতিহাসিক বিবরণ ও ঘটনাপঞ্জি লিপিবদ্ধ করা ঐতিহাসিকের কাজ নয় এবং জাতির উত্থান পতনের কারণগুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মাতৃভূমি তিউনিসে পুনরায় ফিরে আসেন কিন্তু মাত্র ভাবে জনগণ তাকে সম্মান দেননি। অবশেষে ১৩৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মিশারে চলে যান। সেখানে তিনি আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে মিশর সুলতান তাকে প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করেন। মিশরের কায়রোতে তিনি প্রায় ২৪ বছর কাটিয়েছেন। এখানেই তিনি 'আত তারিক' নামক আত্মচরিত গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি সমাজবিজ্ঞান ও বিবর্তনবাদ সম্পর্কে অনেক নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার করেন। বিবর্তনবাদের নতুন তথ্য ইবনে খালদুন সর্বপ্রথম উদ্ভাবন করেন। ইতিহাস সম্পর্কে তাহার লেখা 'কিতাব আল ইবর' বিশ্বের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ। ইবনে খালদুনের বিভিন্ন রচনাবলী ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হবার পরে সমগ্র বিশ্বে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এমন এক সময় ছিল যখন মুসলিম জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুসলিম জাতি আজ তাদের পূর্বপুরুষদের সুবিশাল জ্ঞান ভান্ডারকে উপেক্ষা করায় আজ বিশ্বের বুকে অশিক্ষা, দারিদ্রতা ও পরমুখাপেক্ষী জাতি হিসেবে পরিণত হয়েছে। ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে বাদশা তৈমুর আক্রমণ করেন এবং মিশার অভিযানের প্রস্তুতি নেন ঠিক এ সময়ে ইবনে খালদুন মিশার সুলতানের অনুরোধে একটি শান্তি চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে বাচ্চা তৈমুরের দরবারে উপস্থিত। দীর্ঘ আলোচনার পর বাদশা তৈমুর ইবনে খালদুনের জ্ঞান বুদ্ধি ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তার শান্তি প্রস্তাব মেনে নেয়। তৈমুর তার মিশর অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন ইবনে খালদুন তার জ্ঞান, বুদ্ধিও প্রতিভা দিয়ে একটি অনিবার্য সংঘাত থেকে মিশর দেশ ও মিশর এর অধিবাসীদের রক্ষা করেন। বাদশা তৈমুরের বিশেষ অনুরোধে ইবনে খালদুন দামেস্কে কিছুদিন অবস্থান করেন। তারপর আবার মিশরে ফিরে আসেন। পৃথিবীর বিখ্যাত এই মুসলিম রত্ন ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে মিশরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি মুসলিম তথা বিশ্ববাসীর জন্য যে জ্ঞান রেখে গেছেন তা ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
সংগ্রহে - মোঃ তৈয়েবুর রহমান
দারুণ তথ্য। দুই একজায়গায় বাক্য গঠন একটু ভুল আছে। সেগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।
উত্তরমুছুন