বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার এর আগে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য মধ্যযুগের দীর্ঘপথ ভ্রমণকারী ইবন বতুতা যিনি প্রায় ৭৫ হাজার মাইল বা ১,২০,০০০ কিমি পথ ভ্রমণ করেন।তার সাধারণ নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ আল লাওয়াতি আততানজিহ ইবন বতুতা। চীন সহ পৃথিবীর অনেক জায়গায় তিনি "শামস-উদ্-দ্বীন" নামেও পরিচিত। ভারতে "মাওলানা বদর উদ্দিন" নামে পরিচিত।১৩০৪ সালে মরক্কো এর তানজিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বংশধর আরবী ভাষী তার পূর্বপুরুষরা কয়েক পুরুষ ধরে ছিলেন কাজী বা বিচারক। তার নিজের শহর তানজিয়া তিনি বিচার ও সাহিত্য শিক্ষা নেন শিক্ষা শেষে ১৩২৫ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে মক্কায় তীর্থ বা হজ করতে বার হন । তার লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় কর্তব্য পালন ও মিশর, সিরিয়া ও হেজাযের বিখ্যাত পণ্ডিতদের নিকট থেকে আরও বেশি শিক্ষা গ্রহণ যা পেতে সাহায্য করেছিল সুফি সাধকের এবং জ্ঞানী ব্যক্তির একটি দীর্ঘ সারির সান্নিধ্য যাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, মূলত দামাস্কাস থেকে তিনি অনেক শিক্ষা পদক পেয়েছিলেন। এই শিক্ষা তাকে বিচারক হিসাবে অনেক সাহায্য করেছিল। এবার তার ভ্রমণের কথা আলোচনা করা যাক তিনি ৩০ বছরে প্রায় ৪০ বিদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। ইবন বতুতাই একমাত্র পরিব্রাজক যিনি তার সময়কার(মধ্যযুগের) সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং তৎকালীন সুলতানদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিশর, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। ইবন বতুতা মার্কো পোলোর(ইবন বতুতার ভ্রমনের কিছুকাল পূর্বে এমন দীর্ঘ ভ্রমণ করে বিখ্যাত হয়েছিলেন ভেনিসের ব্যবসায়ী এবং পরিব্রাজক মার্কো পোলো) তিনগুণ বেশি পথ সফর করেছিলেন। ভ্রমণকালে তিনি এই উপমহাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, সুফি সাধক, সুলতান, কাজি এবং আলেমদের সাক্ষাৎ লাভ করেন।দেশে ফেরার পরে মরোক্কোর সুলতান আবু ইনান ফারিস তার ভ্রমণকাহিনীর বর্ণনা লিপিবদ্ধ করার জন্য কবি ইবনে যোজাইয়াকে নিয়োগ করেন। এই ভ্রমণকাহিনীর নাম রিহলা। এটিকে ১৪শ শতকের পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম দলিল বা প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৫৮ সালে রিহলা গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ বের হয়। ১৩৩৩ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর আরবি ৭৩৪ হিজরির পহেলা মহররমে ভারতের পাঞ্জাবে পৌছান। ভারতে তিনি প্রায় ৭ বছর অবস্থান করেন।দিল্লির সুলতান মোহাম্মদ শাহ তাকে "আজিজ" (সম্মানিত পদবী) দ্বারা সম্মানিত করেন এবং তাকে সুলতান কর্তৃক মালিকি সম্প্রদায়ের কাজী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তাকে দুটি গ্রাম দেওয়া হয় যার রাজস্ব দ্বারা তিনি তার নিজের খরচ চালাবেন। কাজির দায়িত্ব পালন করার সময় ইবন বতুতা বে হিসাবি খরচ করতে লাগলেন যা দিল্লির সুলতানের দৃষ্টিগোচর হয় যার ফলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। এদিকে ইবন বতুতাও সুলতানের রহস্যময় আচরণে ত্যক্ত হয়ে ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই তিনি ভারত থেকে মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ,চীন ইত্যাদি দেশ ভ্রমণ করেন।১৯৬৮ অথবা ১৯৬৯ সালে এই মহান ভ্রমণপিপাসু দার্শনিক মরক্কে মৃত্যুবরণ করেন।
কলমে - মোঃ তৈয়েবুর রহমান
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন